1. admin@sylheterkujkhobor.com : admin :
মঙ্গলবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১:৪২ অপরাহ্ন

টাকার বিনিময়ে দাগ খতিয়ান বদলে ও ছিড়ে ফেলে সিলেট সাব রেজিস্ট্রার অফিসের একটি চক্র

  • আপডেট সময় : সোমবার, ২৩ আগস্ট, ২০২১
  • ২৮৭ বার পঠিত

ডেস্কঃ সিলেট সাব রেজিস্ট্রার অফিস। কিছু অসাধু কর্মকর্তার অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও জালিয়াতির কারণে সরকারের এই প্রতিষ্ঠানটি ”দুর্নীতির আখড়া” হিসেবে পরিণত হয়েছে।

অনিয়ম ও দুর্নীতির মাত্রা দিন দিন বাড়তে থাকলেও, কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে নেওয়া হচ্ছে না কোনো কার্যকর ব্যবস্থা! ফলে দীর্ঘদিন ধরে জনগণের বহু মূল্যবান জমির কাগজাদি জালিয়াতির মাধ্যমে গায়েব করে দিচ্ছে এই অফিসেরই একটি চক্র।

অফিসের রেকর্ডরুমে রক্ষিত বালাম বই থেকে পৃষ্ঠা ছিড়ে নতুন দলিলের পৃষ্ঠা লাগিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে অহরহ। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে দাগ খতিয়ান বদলে দিয়ে এক জনের জমি অন্যজনের নামে লিখে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে সিলেট সাব রেজিস্ট্রার অফিসের কিছু অসাধু কর্মচারীরা। সবকিছু দেখেশুনেও নীরব ভূমিকা পালন করছেন উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা! অফিসের রেকর্ডরুমে রক্ষিত বালাম বই থেকে পৃষ্ঠা ছিড়ে নতুন দলিলের পৃষ্ঠা লাগিয়ে দেওয়ার একটি ঘটনা সংক্রান্ত অপরাধীদের স্বীকারোক্তিমূলক একটি ভয়েস রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল এবং এ নিয়ে গণমাধ্যমে একাধিকবার সংবাদ প্রকাশিত হলেও টনক নড়েনি কর্তৃপক্ষের। এদিকে এই চক্রকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন অফিসের রেকর্ড কিপার প্রণয় কান্তি ঘোষ! অনুসন্ধানে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে জেলা রেজিস্টার অফিসের রেকর্ড রুমে সংরক্ষিত বালাম বই থেকে পৃষ্ঠা ছিড়ে বদলে ফেলছে একটি চক্র।

এই চক্রের মূল হোতা সিলেট সাব রেজিস্ট্রার অফিসের বরখাস্তকৃত নকলনবিশ মাহমুদ। তার সহযোগী হিসেবে আছেন উমেদার জুয়েল, রেজাউল, পিওন মফিজ মিয়া, কোম্পানীগঞ্জের কথিত দলিল লেখক জাহান মিয়াসহ আরো কয়েকজন। এই চক্রটি দলিলের পাতা ছিড়া, ক্রেতা-বিক্রেতার নাম বদলানো, দাগ খতিয়ান বদলানো, বালাম বইয়ের পৃষ্ঠা ছিড়ে নতুন দলিল লাগিয়ে দেওয়া, বালাম বই গায়েব করে দেওয়ার মতো জালিয়াতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত। এছাড়াও সিলেট রেজিস্টার অফিসের প্রধান সহকারী (হেড ক্লার্ক) আব্দুল মুতালিবও আছেন এই চক্রের দলে।

গত ২৯ জুন সিলেট জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের রেকর্ড রুম থেকে চিহ্নিত বালাম জালিয়াতি সিণ্ডিকেটের মূল হোতা মাহমুদ ও তার সহযোগী জুয়েল মিলে ২০০১ সালের ৪৬ নম্বর বালাম বইয়ে লিপিবদ্ধ ১০২০ নম্বর দলিলের ৩টি পৃষ্ঠা ছিড়ে নেন।

সেই পৃষ্ঠাগুলো ছেঁড়ার বিনিময়ে মাসুক মিয়া নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে ২ লাখ টাকা নেন মাহমুদ ও জুয়েল।

এ সংক্রান্ত মাহমুদের স্বীকারোক্তিমূলক একটি ভয়েস রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।

ওই রেকর্ডে মাহমুদকে বলতে শোনা যায়, তিনি উমেদার জুয়েলের মাধ্যমে নিয়মিতই বালাম থেকে পৃষ্ঠাসহ পুরো বই গায়েবের মতো ঘটনা ঘটান।

ভয়েস রেকর্ড অনুযায়ী, এসব কাজের যোগানদাতা কোম্পানীগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রার অফিসের কথিত দলিল লেখক জাহান মিয়া। ভয়েস রেকর্ডয়ে রেকর্ডরুমের প্রণয় কান্তি ঘোষের কথাও একাধিকবার উল্লেখ করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া স্বীকারোক্তিমূলক ভয়েস রেকর্ড শুনুন। র্দীঘদিন থেকে উমেদার জুয়েল-জাহানের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বালাম জালিয়াতি করে আসছেন বলে জানান মাহমুদ।

কিন্তু সম্প্রতি দুর্নীতির দায়ে কোম্পানীগঞ্জ অফিস থেকে সিলেটে বদলি হয়ে আসা পিওন মফিজ মিয়ার মাধ্যমে বর্তমানে সব ধরণের বালাম জালিয়াতি চালিয়ে যাচ্ছেন জাহান মিয়া ও উমেদার জুয়েল।

ভয়েস রেকর্ডে মাহমুদ জানান, জাহান মিয়া উমেদার জুয়েল ও পিওন মফিজের সহায়তায় দলিল জালিয়াতির মাধ্যমে অল্প সময়েই বিত্তশালী হয়ে উঠেছেন তারা।

সিলেট সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের একটি সূত্র জানায়, ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে পুরো রেকর্ড রুমে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়। কিন্তু সিসি ক্যামেরা থাকা স্বত্বেও বালাম সিণ্ডিকেটের সদস্যরা কৌশলে ছিড়ে নেন বালাম বইয়ের পৃষ্ঠা।

বিষয়টি জানাজানি হলে দোষীদের বাঁচাতে এবং ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য কালক্ষেপণ করতে থাকেন রেকর্ড কিপার প্রণয় কান্তি ঘোষ। তার বিরুদ্ধেও রয়েছে বালাম জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ।

কিন্তু শেষমেশ উপায়ান্তর না দেখে ঘটনার ২ মাস পর গত ১৮ আগস্ট জেলা রেজিস্ট্রার বরাবরে ঘটনার বিবরণ উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন দেন। কিন্তু সেই প্রতিবেদনে কৌশলে ভয়েস রেকর্ডে বেরিয়ে আসা দোষী ব্যক্তিদের নাম বাদ দিয়ে শুধু বরখাস্তকৃত নকলনবিশ মাহমুদের নাম উল্লেখ করেন রের্কড কিপার প্রনয় কান্তি ঘোষ।

লিখিত প্রতিবেদনে তিনি শুধু ২০০১ সালের ৪৬ নম্বর বালামের ১০২০ নম্বর দলিলের পৃষ্ঠা গায়েবের কথা উল্লেখ করলেও, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে গায়েব হওয়া ৪৭৮০/৬৫ নম্বর দলিলের কথা উল্লেখ করেননি।

এই দলিলটিও গায়েবের পেছনে রয়েছে মাহমুদ-জুয়েল-মফিজ-জাহান সিণ্ডিকেটের হাত। অভিযোগ উঠেছে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে রের্কড কিপার প্রনয় কান্তি ঘোষ তাদেরকে ছেড়ে প্রতিবেদন দাখিল করেন।

উমেদার জুয়েলের নাম বাদ দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়- ”নবিশ মাহমুদ এই দলিল তোলার জন্য আর্জেন্ট আবেদন করেন। দলিলটির স্টিমিট করেন উমেদার রেজাউল এবং নকল নবিশ তানিয়া ওই জাবেদা নকলটি লিখে দেন।” সূত্র জানায়, রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮ এর ৬০ ধারা অনুসারে দলিল রেজিস্ট্রেশন মানে, দলিলে লিখিত বিষয়বস্তু হুবহু বালাম বইয়ে হাতে-কলমে নকল করে মূল দলিলের সর্বশেষ পৃষ্ঠায়, দলিলটি কত সালের, কত নম্বর বালাম বইয়ের, কত পৃষ্ঠা থেকে কত পৃষ্ঠায় নকল করা হলো তার সার্টিফিকেট লিখে কর্মকর্তা কর্তৃক স্বাক্ষর করে দেন।

এভাবে দলিলের রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া শেষ হলেই কেবলমাত্র মূল দলিলটি পক্ষগণকে ফেরত দেয়া যায়। একই জমির একটি খতিয়ানের একাধিক কপি বিভিন্ন অফিসে ও স্থানে বিভিন্ন ভাবে সংরক্ষিত থাকে।

কোনো একটি কপি হারিয়ে গেলে, ছিড়ে গেলে বা অন্য কোনোভাবে নষ্ট হয়ে গেলে, অন্য অফিস বা স্থান থেকে সংগ্রহ করা যায়। কিন্তু দলিল রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে তা যায় না।

কারণ দলিলের নকলকৃত বালামের একটি মাত্র কপি সংরক্ষণ করা হয়। কোনোভাবে বালাম বই হারিয়ে গেলে, পুড়ে গেলে কিংবা অন্য কোনোভাবে নষ্ট হয়ে গেলে দলিলটির কপি কোনোভাবেই সংগ্রহ করা যায় না।

ফলে মামলা মোকদ্দমা বা অন্য কোনো প্রয়োজনে সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা প্রমাণ কঠিন হয়ে পড়ে। সুরক্ষিত ও আধুনিক রেকর্ড রুম ব্যবস্থাপনার অভাবে রের্কড কিপার প্রনয় কান্তি ঘোষের মতো লোক অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারির চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রতিনিয়ত বালাম বইয়ের ক্ষতি করে আসছেন।

সিলেট জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের রেকর্ড কিপার প্রণয় কান্তি ঘোষের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ ঘটনায় একটি প্রতিবেদন দাখিল করেছেন।

কেনো এই প্রতিবেদনে উমেদার জুয়েলের নাম দেয়া হয়নি এমন প্রশ্নের জবাবে প্রণয় বলেন, তিনি তদন্তে তার বিষয়ে কিছুই পাননি! তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভয়েস রেকর্ড তিনি শুনেননি! প্রনয় আরও জানান, সোমবার তিনি অফিসে আসবেন না, মঙ্গলবারে রেকর্ডটি তার কাছে পাঠানোর জন্য। তিনি শুনবেন।

এই ঘটনার সাথে জড়িত বলে যাদের নাম উঠে আসছে-তারা বিভিন্ন সময়ে দলিল জালিয়াতি ও রেকর্ড ধ্বংসের কাজে জড়িত। নতুন করে দলিল জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর এই চক্রের সন্ধান মিলে। সিলেট লাইভ এই চক্রের বিরুদ্ধে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরও খবর

ফেসবুকে আমরা

© All rights reserved © 2021 sylheter kuj khobor.com
Theme Customized By BreakingNews