1. admin@sylheterkujkhobor.com : admin :
মঙ্গলবার, ১৭ মে ২০২২, ০৪:৫১ অপরাহ্ন

নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা কিন্ত মানব পাচারে পারদর্শী মানুষকে ঠকিয়ে হয়েছেন কোঠিপতি

সিলেটের খোঁজখবর
  • আপডেট সময় : রবিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২২
  • ৪০ বার পঠিত

ডেস্কঃ মানব পাচারকারী চক্রের ভয়ঙ্কর এক সদস্য মৌলভীবাজারের কামরুল আহম্মেদ (৪২)। লেখাপড়া করেছেন মাত্র নবম শ্রেণি পর্যন্ত। দৃশ্যমান কোনো পেশা নেই তার। তবে দীর্ঘদিন ধরে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত।

ভিজিট ভিসা দিয়ে মানুষকে মধ্যেপ্রাচ্যর বিভিন্ন দেশে পাঠাতেন। সবাইকে পাঠাতেনও না। মোটা অংকের টাকা নিয়ে ভুয়া ভিসা ও টিকেট দিতেন যাত্রীদের। পরে যাত্রীরা বিমানবন্দরে গিয়ে সেটি বুঝতে পারতেন আর ধরা খেতেন।

তবে কে গেল আর কে যেতে পারেনি এই নিয়ে কামরুলের কোনো মাথাব্যথা নেই। সবাইকে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে ভালো সুযোগ-সুবিধা করে দেওয়ার নাম করে ৫০০ জনের কাছ থেকে অন্তত ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত রেহাই পাননি কামরুল।

সৌদিআরব পাঠানোর নাম করে নিজ এলাকা মৌলভীবাজারের এক নারীকে ঢাকায় এনে জিম্মি করেন তার বাসায়। সেই বাসায় তার সহযোগীরা ওই নারীকে ধর্ষণ করে। পরে ভুক্তভোগী নারী র‌্যাব’র কাছে সহযোগিতা চান। খবর পেয়ে র‌্যাব তাকে উদ্ধার করে। ওই নারীর দেয়া তথ্য নিয়ে অভিযান চালিয়ে কামরুল ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৩।

কামরুল ছাড়া গ্রেপ্তারকৃত বাকিরা হলেন- খালেদ মাসুদ হেলাল (৩৬), তোফায়েল আহম্মেদ (৩৮) ও মো. জামাল (৪২)। গ্রেপ্তারের সময় এই চক্রের কাছ থেকে ২৭টি পাসপোর্ট, ১টি কম্পিউটার, ১০০টি ভিসার কপি, ১২৫টি টিকিট, ৪টি মোবাইল ফোন ও প্রিন্টার উদ্ধার করা হয়।

র‌্যাব জানায়, কামরুল মানবপাচার করলেও ২০১৯ সালের দিকে ভিজিট ভিসায় দুবাই যান। তারপর সেখানে রেসিডেন্স ভিসা নেন। প্রাইভেটকার চালিয়ে যা আয় করতেন সেটা দিয়েই চলতেন। কিন্তু করোনাকালে তিনি সংকটে পড়েন। এজন্য ২০২১ সালে সেই গাড়ি বিক্রি করে চলে আসেন দেশে। শুরু করেন ভিজিট ভিসায় মানবপাচার। জনশক্তি রপ্তানির কোনো লাইসেন্স না থাকলেও দেদারছে বিভিন্ন দেশে লোক পাঠাতেন। বিভিন্ন ট্যুর ও ট্রাভেল্‌স এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করে অবৈধভাবে ভিজিট ভিসায় লোক পাঠাতেন। ভিজিট ভিসায় পাঠালেও স্থায়ী চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার নাম করে প্রতিজনের কাছ থেকে নিতেন ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা।

শনিবার (১৬ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর কাওরান বাজারে র‍্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাব- ৩ অধিনায়ক (সিও) লে. কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, রামপুরা এলাকায় একটি মানবপাচার ও প্রতারক চক্র মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে ভুয়া ভিসা ও টিকিট সরবরাহ করে। তারা বিদেশ যেতে চায় এমন বেকার যুবক-যুবতীদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়ে তাদের সর্বস্বান্ত করছে। সহজ-সরল ব্যক্তিরা বিমানবন্দরে যাওয়ার পর ভিসা ও টিকিট জাল হওয়ায় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাদের বিমানবন্দর থেকে ফিরিয়ে দেয়। এমন কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে র‍্যাব-৩ এর একটি দল গোয়েন্দা নজরদারি ও ছায়া তদন্ত শুরু করে।

জানা যায়, গত ১২ এপ্রিল সৌদি আরব পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে মৌলভীবাজার থেকে একজন নারীকে ঢাকার রামপুরায় আনেন কামরুলের সহযোগী তোফায়েল। তারপর রামপুরায় কামরুলের বাসায় তাকে আটকে রাখেন। তোফায়েল ওই নারীকে শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাব দেন। তাতে তিনি রাজি না হওয়ায় ধর্ষণ করেন। একপর্যায়ে ওই নারী মোবাইল ফোনে র‌্যাব’র কাছে সাহায্য চাইলে র‌্যাব’র একটি দল ১৩ এপ্রিল রাতে অভিযান চালিয়ে ভুক্তভোগী নারীকে উদ্ধার করে। পরে ওই নারীর দেয়া তথ্যমতে রামপুরা ও হাতিরঝিল এলাকা থেকে কামরুল আহম্মেদ ও তার তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে।

উদ্ধার হওয়া নারীকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র‌্যাব’র এই কর্মকর্তা বলেন, সাইফুল ইসলাম শান্ত নামে একজনকে তিনি বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের পর সাইফুল যৌতুক বাবদ তার কাছ থেকে ধাপে ধাপে ৫ লাখ টাকা আদায় করে তাকে ছেড়ে চলে যান। মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে যৌতুকের টাকা ওই নারীর বাবা মানুষের কাছ থেকে ধারদেনা করে জোগাড় করেছিলেন। পাওনাদাররা টাকার জন্য চাপ দিতে থাকলে ভিকটিম তার গ্রামের দালাল তোফায়েলের শরণাপন্ন হন। তোফায়েল গৃহকর্মী হিসেবে তাকে সৌদি আরব পাঠানোর প্রলোভন দেখায়। এরপর সৌদি আরব যেতে হলে আরবি ভাষার ট্রেনিং করতে হবে, এ কথা বলে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসে ও কামরুলের বাসায় আটক রেখে ধর্ষণ করে। ঘটনার পর ওই নারী বাদী হয়ে রামপুরা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন।

র‍্যাব-৩-এর সিও বলেন, কামরুল মানব পাচারকারী চক্রের মূলহোতা। তাদের জনশক্তি রপ্তানির কোনো লাইসেন্স নেই। কিন্তু তারা দীর্ঘদিন ধরে জনশক্তি রপ্তানির নামে অবৈধভাবে ভ্রমণ ভিসার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে লোক পাঠিয়ে আসছিল। চক্রটি মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপে জনশক্তি পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশ যেতে ইচ্ছুক বেকার যুবক-যুবতীদের কাছ থেকে ৫-৭ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নিয়ে জাল ভিসা ও টিকিট ভুক্তভোগীদের হাতে ধরিয়ে দিত। এ বিষয়ে প্রতিকার চাইলে চক্রের গ্রেপ্তার সদস্যরা যোগাযোগ বন্ধ করে বাসার ঠিকানা পরিবর্তন করে ফেলে।

 

এভাবে গত ২ বছরে অন্তত আটবার ঠিকানা পরিবর্তন করেছে চক্রটি। গত ৫ বছরে চক্রটি অবৈধভাবে শতাধিক লোককে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠিয়েছে। যারা বিদেশ গিয়ে কাজ না পেয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। অন্যদিকে এই চক্র পাঁচ শতাধিক লোককে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে জাল ভিসা ও টিকেট সরবরাহ করে প্রায় ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, জনশক্তি রপ্তানি লাইসেন্স না থাকায় বিভিন্ন ট্যুরস ও ট্রাভেলসের সঙ্গে যোগাযোগ করে অবৈধভাবে ভ্রমণ ভিসায় বিভিন্ন দেশে লোক পাঠিয়ে আসছিল কামরুল। তার নামে চট্টগ্রাম কোর্টে একটি চেক জালিয়াতির মামলা এবং মৌলভীবাজার কোর্টে ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের ১৮ লাখ টাকার একটি মামলা রয়েছে। তার বিভিন্ন ব্যাংক একাউন্টে ৩৮ লাখ টাকার ওপরে আছে।

তার অন্যতম সহযোগী জামাল, মাহবুব ইন্টারন্যাশনালের এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার। মাহবুব ইন্টারন্যাশনাল মানবপাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় তাদের লাইসেন্স ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। একমাস আগে মাহবুব ইন্টারন্যাশনালের এমডি মানবপাচারের দায়ে র‍্যাব-৩ এর হাতে গ্রেপ্তার হন। জামাল সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করে্নে। পাঁচ বছর ধরে তিনি কামরুলের সঙ্গে প্রতারণা এবং মানবপাচারের কাজ করে আসছিলেন। তার নামে মাদক মামলা রয়েছে।

 

অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করা খালেদ ২০০১ সাল থেকে দীর্ঘ ১৫ বছর সৌদি আরবে ছিলেন। ২০১৬ সালে দেশে ফিরে মৌলভীবাজার রাজনগরে রেস্টুরেন্টের ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসায় ব্যর্থ হয়ে কামরুলের সঙ্গে প্রতারণা ও মানবপাচারের কাজে জড়িয়ে পড়েন। তোফায়েলের পেশা ড্রাইভিং। মৌলভীবাজারে তার সিএনজি পার্টস এবং ডেকোরেটরসের ব্যবসা রয়েছে। অতি লাভের আশায় সেও কামরুলের অপকর্মের সঙ্গী হয়। উদ্ধার করা নারী তোফায়েলের গ্রামের আত্মীয়। ওই নারীর অসহায়ত্বের সুযোগে ধর্ষণের লক্ষ্য নিয়েই সৌদি আরবে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়েছিলেন। তোফায়েলের নামে একটি চুরির মামলা রয়েছে।




Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরও খবর










x