1. admin@sylheterkujkhobor.com : admin :
শনিবার, ৩১ জুলাই ২০২১, ১১:০৪ পূর্বাহ্ন

“বিক্রি হলে খাবার জুটবে, তা না হলে বউ আর ৩ মেয়েকে নিয়ে না খেয়ে থাকব”

  • আপডেট সময় : সোমবার, ৫ জুলাই, ২০২১
  • ১১৯ বার পঠিত
ফাইল ছবি

ডেস্কঃ করোনা সংক্রমণ এবং মৃত্যুর সংখ্যা দৈনিক বাড়ছে। এমন অবস্থায় সরকার উদ্বিগ্ন। প্রয়োজন সংক্রমণ ঠেকানো, তাই তো লকডাউন। কিন্তু এর থেকেও বেশি উদ্বেগে আরেক শ্রেণির মানুষ। তারা শ্রমজীবী, নিম্ন মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ। প্রত্যাশা কেবল খাদ্যের। কারও কারও আছে পরিবারের কারও ঔষধ কেনার টাকার প্রয়োজন। কেউ বা আবার ভাগ্যকে ছেড়ে দিচ্ছেন সৃষ্টিকর্তার উপরে। তাহলে চলুন শুনি এসব শ্রমজীবী মানুষের গল্প, যা লকডাউনের আগের দিন বুধবার থেকে লকডাউনের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সংগৃহীত।

কঠোর লকডাউন শুরুর আগের সন্ধ্যায় সিলেট নগরীর রিকাবীবাজারে কথা হয় পান-সুপারির ব্যবসায়ী আমির হোসেনের সাথে। কাল থেকে লকডাউন, কী করবেন ভাবছেন?

তিনি বলেন, ‘কী করব ভাই বুঝতে পারছি না। প্রতিদিন খাবারের বন্দোবস্ত হলে আমার আর কিছু লাগে না। এই ৭ দিন আমার কাছে ৭ বছরের সমান। কারণ আমার ঘরে ১০০ গ্রাম চালও সংরক্ষিত নাই।’

কী বলেন? এতদিন ধরে ব্যবসা করেন, এটুকু সামর্থ্য নেই? ‘পরিবারে একা উপার্জন করি আমি। আমার মা, ভাই, স্ত্রী-সন্তান এবং আমি মিলে মানুষ ৫ জন। খাবার খরচ মাসে অন্তত ৮ হাজার টাকা। বাসা ভাড়া ৭ হাজার টাকা। ছোট ভাই ক্লাস টেনে পড়ে, ছোট বাচ্চার খরচ, মায়ের ঔষধ সব মিলে অন্তত ১৮ থেকে ২০ হাজার খরচ প্রতিমাসে। কিন্তু মাসে ব্যবসা করে সর্বোচ্চ উপার্জন করি ১২ হাজার টাকা। অভাব মেটাতে প্রতিদিন পানের দোকান খোলার আগে ভোরে এসে সবজির দোকান, ফলের দোকানে কাজ করে ১০০ থেকে দেড়শ টাকা পাই। যাবার সময় বাজার করে নিয়ে যাই। তাতেই চলে সংসার। কিছুদিন আগে আমার একটি বাচ্চা হয়েছে। তখন ঠিকমতো ব্যবসাও করতে পারিনি। স্ত্রীর চিকিৎসা এবং ডেলিভারির খরচ মিলিয়ে ২৭ হাজার ঋণ করেছি। এটাই আমার কাছে বড় বোঝা। সকাল হলে ঘুম ভাঙে ঋণদাতার ফোনে। আর কত? কে দেবে ঋণ? আমাদের কিছু চাল-ডাল দিয়ে সারা বছর লকডাউন দিলেও সমস্যা ছিল না।’

এবার লকডাউনের প্রথম দিনে বেলা দেড়টায় সিলেট নগরীর চৌহাট্টা মোড়ে পরিশ্রান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন রিকশাচালক ময়নুল। কথা হয় তার সাথে। কথা বলে জানা যায় বাড়ি তার রংপুর, থাকেন সিলেট নগরীর পাঠানটুলা এলাকার একটি গ্যারেজে। পরিবারে আছেন স্ত্রী, ২ সন্তান ও বাবা-মা। তারা রংপুরেই থাকেন। পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। যা উপার্জন করেন, নিজের খরচ বাদে সব টাকা পাঠান পরিবারের কাছে। জানতে চাইলাম, কত টাকা হলো আজ উপার্জন?

দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার উত্তর, ‘এখন পর্যন্ত ৬৫ টাকা রোজগার হয়েছে। একদিকে বৃষ্টি, অন্যদিকে লকডাউন। মানুষ না থাকলে উপার্জন হবে কী করে?’ কিন্তু যেভাবে করোনা বাড়ছে, লকডাউন তো প্রয়োজন। করোনায় মরার আগে ক্ষিধায় মরব। উপার্জন না হলে খাব কী? আমাদের তো জমানো টাকা নাই। প্যাডেল ঘোরালে টাকা আসে। প্যাডেল না ঘোরালে খাবার দেবে কে?’

এ তো গেল তাদের গল্প। আসুন শুনি হাশিম নামের এক সবজি বিক্রেতার কথা। তিনি অবশ্য পেশা বদল করেছেন। বাড়ি তার নোয়াখালি জেলায়। পরিবারে স্ত্রী, সন্তান আর মা আছেন। সব মিলিয়ে চারজনের পরিবার। নিত্য উপার্জনেই চলে তার সংসার। লকডাউনের আগের দিনও তিনি ছিলেন সেদ্ধ ডিমের ব্যবসায়ী। কিন্তু লকডাউনে পেশা বদল করে ভ্যানে করে বিক্রি করছেন সবজি। বিকেল ৪টার দিকে তার কাছে জানতে চাই, কত টাকার সবজি বিক্রি হলো?

মুচকি হেসে বললেন, ‘৬০০ টাকার মতো হবে।’ এবার পোষাবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এক-দেড়শ টাকা লাভ বের হবে। কোনোরকমে চলার চেষ্টা করা। তা না হলে খাব কী? মাল (সবজি) এনেছি এক হাজার টাকার। বিক্রি করে বিকেলে টাকা দেব। আমার পরিচিত একজন আড়তে ব্যবসা করে। গতকাল পর্যন্ত ডিম বেচতাম। লকডাউন তো, কী আর করব? তাই বুদ্ধি করে ভাবলাম ভ্যানে করে পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে সবজি বেচি।’

ঝুম বৃষ্টির লকডাউনের দ্বিতীয় দিনে সিলেট নগরী অনেকটা ফাঁকা হলেও ২০ টি কাঁঠাল নিয়ে বেরিয়েছেন প্রায় ৬০ বছর বয়সী আমির আলী। পুঁজি তার ১ হাজার টাকা। বেলা তখন ২টা বাজে। অলি-গলি ধরে ছুটলেও এখনও বিক্রি হয়নি একটি কাঁঠালও। তার কাছে জানতে চাই, লকডাউনে কেমন চলছে দিন?

আমির আলীর উত্তর, ‘সকালে বেরিয়েছি ২০টি কাঁঠাল নিয়ে। বিক্রি হলে খাবার জুটবে। তা না হলে বউ আর ৩ মেয়েকে নিয়ে না খেয়ে থাকব। তবে এখনও বেলা আছে, ২-৩টি কাঁঠাল বিক্রি হবে আশা করি। এ কে তো লকডাউন, তার ওপর বৃষ্টি। মানুষ নাই, কাঁঠাল নেবে কে?’

প্রশাসনের গাড়ির সাইরেন আর পুলিশের হুইসেল ডিঙ্গিয়ে সন্ধ্যায় ফ্লাক্সে করে চা নিয়ে বের হয়েছেন দিবাকর। চা খেতে খেতেই কথা বলা তার সঙ্গে। প্রতিদিন এভাবে বিক্রি করেন?

‘না, আমি সিটি কর্পোরেশনের সামনে বসে তালার চাবি বানাই, মেরামত করি।’

তাহলে আজ চা নিয়ে কেন?

‘দাদা, পেট চালাতে হবে তো। তিনটা মেয়ে আর স্ত্রী ঘরে। এদের খাবার দেবে কে? কিছু একটা তো করতে হবে। এই লকডাউনে আমাদের গরিবের হয়েছে মরণ। দেখি এখন চা নিয়ে বের হলাম। সৃষ্টিকর্তা ভাগ্যে রাখলে কিছু আয় হলে তা দিয়েই খাব।’

শুক্রবার আম্বরখানা বড়বাজারের প্রবেশমুখে সকাল ৭টা থেকে বসে প্রায় ১০টার দিকে কোদাল কাঁধে নিয়ে ঘরে ফিরছিলেন আজগর মিয়া। ভাগ্যে জোটেনি কাজ। কথা বলতে চাইতেই কাঁধে থাকা কোদাল নামিয়ে বললেন, ‘লকডাউন দিয়ে আমাদের পেটে লাথি মারা হয়েছে। সবাই এসির নিচে বসে আরাম করে খায়। আর আমরা যারা গরিব মানুষ, তাদের কথা কেউ ভাবে না। লকডাউন দিবে ভালো কথা, তাহলে আমাদের খাবার দিলেই তো হয়। লাগলে সারা বছর লকডাউন হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরও খবর

ফেসবুকে আমরা

© All rights reserved © 2021 sylheter kuj khobor.com
Theme Customized By BreakingNews