1. admin@sylheterkujkhobor.com : admin :
মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর ২০২১, ০৬:২১ অপরাহ্ন

সিলেটের গ্রামাঞ্চলেও করোনার থাবা

  • আপডেট সময় : মঙ্গলবার, ১৩ জুলাই, ২০২১
  • ১৭৭ বার পঠিত
ফাইল ছবি

খোদেজা বেগম (৭০) কয়েক দিন ধরে জ্বরে আক্রান্ত। সাথে রয়েছে কিছুটা শ্বাসকষ্টও । বসবাস করেন উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে। চিকিৎসার জন্যে তাকে নিয়ে আসা হয় সুনামগঞ্জের দিরাই হাসপাতালে। কর্তব্যরত চিকিৎসক সন্দেহবশত এ্যান্টিজেনের মাধ্যমে ওই মহিলার করোনা টেস্ট করেন। নমুনা নেয়ার মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই হাসপাতালে মারা যান তিনি। মারা যাওয়ার কিছুক্ষণ পর তার রিপোর্ট করোনা পজিটিভ আসে। তিনি দিরাই উপজেলার সরমঙ্গল ইউনিয়নের ধনপুর (চন্দ্রপুর) গ্রামের রাশেদ মিয়ার স্ত্রী।

দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. স্বাধীন কুমার দাস বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন , হাসপাতালে আসার পরে টেস্টে তার করোনা পজিটিভ আসে। রিপোর্ট আসার কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি মারা যান। তিনি গ্রামে বসবাস করতেন। এখন খোদেজার মতো গ্রামেও করোনা রোগী পাওয়া যাচ্ছে।
সরমঙ্গল ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ড সদস্য দুলাল হোসেন সিলেটের ডাককে জানান , খোদেজা বেগম শ্যামারচরে তার মেয়ের সাথে একই পরিবারে বসবাস করতেন। মেয়ের বাড়ীর লোকজন তাকে সেখান থেকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। মারা যাওয়ার পর তাদের কয়েকজন এসে লাশ দাফন করে গেছেন। এ ঘটনার পর এলাকার লোকজনের মাঝে করোনা আতংক বিরাজ করছে।

হাল্কা জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে নিজ বাড়িতেই চিকিৎসা নিচ্ছিলেন নির্মলা রানী গোপ (৬৮)।কিন্তু জ্বর না কমায় জগন্নাথপুর হাসপাতালে যান। কর্তব্যরত চিকিৎসক নির্মলা গোপের নমুনা সংগ্রহ করেন। পিসিআর টেস্টের রিপোর্টে পরদিন রাতে তার করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে। পজিটিভ রিপোর্ট আসার কয়েক ঘণ্টা পর ভোররাতে তিনি নিজ বাড়ীতে মারা যান। তিনি জগন্নাথপুর পৌরসভার ৯ নং ওয়ার্ডের যাত্রাপাশা গ্রামের সুশীল গোপের স্ত্রী। জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে নিজ বাড়িতে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

জগন্নাথপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মধু সুধন ধর সিলেটের ডাককে জানান , নির্মলা গোপ বাড়ীতে থেকে চিকিৎসা নেন। রাতে করোনা শনাক্তের পর ভোরে তিনি মারা যান। জগন্নাথপুরে গ্রাম পর্যায়ে করোনা শনাক্ত হয়েছে বেশ আগে থেকেই। বর্তমানে গ্রামে রোগী বেশি শনাক্ত হচ্ছেন। গত শনিবার একদিনেই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ১৬ জন করোনা রোগী শনাক্ত হন।

দিরাই উপজেলার ধল এলাকার মজুমদার আলী( ৫৫) (ছদ্মনাম) কয়েক দিন ধরে মৃদুজ্বরে আক্রান্ত। গ্রামের বাজারের পল্লী চিকিৎসকের পরামর্শে তার চিকিৎসা চলছিল।

কিন্তু, অবস্থার কোন পরিবর্তন না হওয়ায় সিলেট নগরীর একটি হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে ভর্তির পর অবস্থার অবনতি হলে ইনসেনটিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ)-এ নেয়া হয়। টানা ৪ দিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকার পর তার করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়। এতে বিপাকে পড়েন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কারণ হাসপাতালে করোনা রোগীর জন্যে আইসিইউ বেড নেই। দ্রুত রোগী সরানো না হলে অন্য রোগীদের সংক্রমণ হবে। কিন্তু, দিনভর চেষ্টা করেও সিলেটের কোনও হাসপাতালে আইসিইউ বেড জোগাড় করা সম্ভব হয়নি। পরে নিরুপায় হয়ে বিকেলে তাকে নিয়ে স্বজনরা রাজধানী ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। রাজধানীর ধানমন্ডির একটি হাসপাতালে তার জন্যে একটি আইসিইউ বেড জোগাড় করেছেন স্বজনরা ।

গত পরশু জামালগঞ্জের ভীমখালী ইউনিয়নের কান্দাগাঁও গ্রামের সুবুর উদ্দিনের পুত্র আব্দুর রহমান (৮০), একই গ্রামের আবু লেইছের মেয়ে তাসলিমা বেগম (১৮), সাচনাবাজার ইউনিয়নের সাচনাবাজারের শ্যামচরনের পুত্র প্রার্থ সারথী (২৮), ফেনারবাক ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামের নুর জামালের স্ত্রী মর্জিনা বেগম (৩০), বেহেলী ইউনিয়নের রাধানগর গ্রামের মৃত নইমুল্লাহর পুত্র আব্দুল গণি (৫২) ও বদরপুর গ্রামের রানু মিয়ার স্ত্রী ছমিরুন বেগমের (৪০) করোনা ধরা পড়ে ।

এভাবে দিরাই , জগন্নাথপুর , জামালগঞ্জ উপজেলার মত সুনামগঞ্জ জেলার অন্যান্য উপজেলায়ও করোনার সংক্রমণ বেড়েছে। জেলা ও উপজেলা সদরের বাইরের গ্রামাঞ্চলেও করোনা থাবা বসিয়েছে বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন।

জানা গেছে , দিরাই উপজেলা থেকে অন্তত ২০ কিলোমিটার দূরবর্তী গ্রামের নাম মেঘনা-বারোঘর। গ্রামের চারদিকে কেবল অথৈ পানি আর পানি। নৌকা ছাড়া গ্রামের এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যাওয়ারও বিকল্প সুযোগ নেই। পানিবন্দি দ্বীপের মতো এই গ্রামে সম্প্রতি করোনা শনাক্ত হয়েছে। কেবল এই গ্রামই কিংবা সুনামগঞ্জ জেলা নয় সিলেট , মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার প্রত্যন্ত গ্রামেও করোনা আক্রান্ত রোগী ধরা পড়ছে। গ্রামাঞ্চলে দিন দিন বাড়ছে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ।

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের কালীবাড়ি গ্রামের জনৈক সংবাদকর্মীর সস্ত্রীক করোনা পজিটিভ রিপোর্ট এসেছে। তার স্ত্রী ৭ মাসের অন্ত:সত্ত্বা বলে জানা গেছে।

এদিকে, গ্রামাঞ্চলে করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধির অনেক কারণও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বেশ কয়েকটি এলাকার স্থানীয় লোকজনের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা হয়।

তারা জানান , জেলা ও উপজেলা সদরে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত টহল দেন। টহলের পাশাপাশি নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালনা করা হয়। এর সাথে রয়েছে বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা।

জেলা ও উপজেলা সদরে আইনশৃংখলা বাহিনী কঠোর থাকায় লোকজনের মাঝে আতংক থাকে। নির্দিষ্ট সময়ের পর দোকানপাট বন্ধ করে দেয়া হয়। একসময় ক্রেতা শুন্য হয়ে যায় লোকে লোকারণ্যে থাকা হাটবাজার। কিন্তু, গ্রামের বাজারের চিত্র ঠিক এর উল্টো। কিছু গ্রামের বাজারে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতির দেখা মিললেও বেশির ভাগ গ্রাম্য বাজারে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যের দেখা মেলেনি । এই সুযোগে গ্রামের বাজারের ব্যবসায়ীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। স্বাস্থ্যবিধি মানা তো দূরের কথা অনেকে করোনা নিয়ে হাসি-ঠাট্টাও করেন। ব্যাপক লোকসমাগম ও জনসচেতনতার অভাবে এখন গ্রামে গ্রামে করোনার সংক্রমণও ছড়িয়ে পড়েছে।

সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী , গতকাল সোমবারের আগের ২৪ ঘণ্টায় সিলেট জেলায় ২৬১ জন, সুনামগঞ্জ জেলায় ৪৪, হবিগঞ্জ জেলায় ৪০ ও মৌলভীবাজার জেলায় ৩০ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। নতুন শনাক্তসহ সিলেট বিভাগে মোট শনাক্তের সংখ্যা ২৯ হাজার ৯১৮ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে করোনায় ৫ জন মারা গেছেন।

স্বাস্থ্যবিধি না মানলে গ্রামে করোনা ভয়ংকর রুপ নিতে পারে বলে জনস্বাস্থ্যবিদরা জানিয়েছেন।

হবিগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম মুস্তাফিজুর রহমান বলেন , সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে হবিগঞ্জের গ্রামাঞ্চলেও করোনার সংক্রমণ বেড়েছে। আমরা লোকজনকে স্বাস্থ্য বিধি মানাতে চেষ্টা করে যাচ্ছি। সচেতন হলে সংক্রমণ কমানো যেত। কিন্তু, না মানলে কেবল শহর নয়; গ্রামের অবস্থাও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. শামস উদ্দিন সিলেটের ডাককে বলেছেন , লোকজন তাদের ইচ্ছেমতো চলাফেরা করলে তো করোনা সংক্রমণ বাড়বেই। বার বার অনুরোধ করার পরেও যদি তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলেন , মাস্ক না পরেন , বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হন -তাহলে আমরা কি আর করব। সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আইনশৃংখলা বাহিনীকে এক্ষেত্রে আরও কঠোর হতে হবে বলে জানান তিনি।

স্বাস্থ্য সিলেট বিভাগের সহকারী পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. নুরে আলম শামীম বলেন , শহর ও গ্রামে বর্তমানে করোনা সংক্রমণের চিত্র একই। শহরের মতো সমানভাবে গ্রামেও করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছেন। গ্রামের মানুষ আগে উদাসীন ছিলেন যে , করোনা তাদেরকে সংক্রমণ করবে না। তাদের ধারণা ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে । গ্রামের লোকজনকে করোনা থেকে রক্ষার জন্যে অবশ্যই শহরের মতো মাস্ক পড়তে হবে। গ্রামে মাস্ক পড়া নিশ্চিত করা গেলে সংক্রমণের হারও কমে আসবে। করোনার ভ্যাকসিন যাতে সকলে নেন তাও নিশ্চিত করা দরকার। ভ্যাকসিন চলে এসেছে। তিনি যথাযথ প্রক্রিয়ায় ভ্যাকসিন গ্রহণের জন্যে সকলের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরও খবর

ফেসবুকে আমরা

© All rights reserved © 2021 sylheter kuj khobor.com
Theme Customized By BreakingNews